শনিবার , জুলাই 31 2021
Home / গুরুত্বপূর্ণ / ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার কবর রচিত হয়-

২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার কবর রচিত হয়-

প্রকাশ কাল: ২১২১ ঘন্টা, জুন ২২, ২০২২

আমিনুল ইসলাম

বুধবার ঐতিহাসিক ২৩ জুন। বাংলার শেষ নবারের নাটকীয় পরাজয় এবং পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। ১৭৫৭ সালের এইদিনে পলাশী প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফচক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়। বেদনাবহ স্মৃতিকে স্মরণ করে এ দিনটিকে পালন করে এ অঞ্চলের মানুষ। দিনটিতে কি ঘটেছিলো তা জানাতে একবার নয়,একাধিকবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মুর্শিদাবাদে ঘুরতে হবে। প্রতিটি স্বাধীনচেতা বাঙ্গালীকে। তবেই জানতে পারবে সত্যিকারের ইতিহাস। নবাবকে এবং কেনইবা তাকে যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত হতে হলো। আর কিবা ছিলো তার অপরাধ। এমন কথা আজোও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। কিন্তু না। সিরাজদ্দৌলা ছিলেন একজন সত্যবাদি,তেজস্বী এবং সরল বিশ্বাসের মানুষ আর সেই জন্যই তাকে নিরবে পরাজয় করাতে পেরেছে তারই স্বজন রা। আর গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে বাংলার মসনদ থেকে সরিয়ে দেশকে তুলে দেয় ইংরেজদের হাতে। প্রতিবছর এই দিবসটি পালনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ,কোলকাতা এবং আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সমাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করে। ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগেশঠ, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, নন্দকুমার প্রমুখ। এই স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রীদের প্রথম শিকার ছিল স্বাধীনতার অতন্দ্রপ্রহরী, মুক্তি সংগ্রামের প্রথম সিপাহসালার নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদন ও প্রধান আমাত্য মোহনলাল কাশ্মিরী। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। কিন্তু তা অন্যসব দিনের চেয়ে ছিল আলাদা। কারণ ওইদিন মুর্শিদাবাদ থেকে ১৫ ক্রোশ দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাসহ পুরো উপমহাদেশের স্বাধীনতার কবর রচিত হয়েছিল।
ইতিহাস থেকে জানাগেছে,১৭৪০ সালে গিরিয়ার যুদ্ধে নবাব সরফরাজ খাঁ ও মারাঠা দূত ভাঙ্কর পন্ডিত কে বিশ্বাসঘাতকতা পুর্বক হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন নবাব আলী বর্দ্দী খাঁ। আর তার মৃত্যুর পর তারই দৌহিদ্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে নবাব হন। তার পিতা জৈনদ্দিন খাঁন ও মাতা আমিনা বেগম। সিরাজদ্দৌলা ছিলেন মোঘল বাদশাহদের ন্যয় সৌখিন ও আড়ম্বর প্রিয়। তিনি বহু অর্থ ব্যায়ে হিরাজিল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন যা আজও ভাগীরতি নদীর তীরে ধ্বাংসাবশেষ বিদ্যমান। সহজ সরল এবং রাজকৌমলী না হওয়াতে নবাব সিরাজ অল্প দিনের মধ্যেই নিজের পরিবারের একাধিক ব্যাক্তির নিকট অপ্রিয় হয়ে উটতে লাগরেন। আর নবাবকে নিয়ে বেতরে ভেতরে চলতে থাকলো গভীর ষড়যন্ত্র। এজন্য তার নিজস্ব কিছু দোষত্রæটিও ছিলো। যেমন,তিনি প্রকাশ্যে প্রকাশ্যে রাজপথে হুসেন কুলীখাকে হত্যা,ধনাঢ্য জগৎশেঠকে রাজ দরবারে চপেটাঘাত করা,নিজ খালা ঘসেটি বেগমকে নজরবন্দি,মোহন লালকে প্রধানমন্ত্রী,মীরমোদনকে প্রধানরক্ষীপদে নিযুক্ত করাই তার পরাজয়ের মুল কারণ বলে প্রতিয়মান। একই সাথে তার গুপ্তচর বিভাগ ছিলো অকর্মন্ন এবং সঠিক খবরগুলো তার নিকট প্রদান করা হতো না। তাইতো সড়যন্ত্রকারীরা মীর জাফরের নেতৃত্বে বিপুল পরিমাণের সৈন্য সামন্ত নিয়েও যুদ্ধের ময়দানে পরাজয় বরণ করে।


কি ঘটেছিলো সেইদিন,(১৭৫৭-২৩জুন)। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক যুদ্ধ নাটক মঞ্চায়িত হয়। এতে নবাব বাহিনীর পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার। যুদ্ধের ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও তার অনুসারী প্রায় ৪৫ হাজার। যে বাহিনীর মধ্যে বিশেষ পারদর্শী ছিলো ৫হাজার মুগল আশ্বারোহী,৭হাজার রাজপুত,পাঠান ও পদাতিক সৈন্য,৪৫জন ফরাসী সৈন্য,সেনাধ্যক্ষ মীরমদন ও মোহন লাল। প্রকৃতির নিয়তির কারণে মুসলধারার বৃষ্টিতে নবারের কামান ও গোলা বারুদ অকেজো হয়ে যায়। মীর জাফর নবাবকে আশ্বাস দেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি সেই আশ্বাস রক্ষা না করে যুদ্ধের ময়দানে নিরব দর্শকের বুমিকায় দাড়িয়ে থাকেন। আর পরাজয় ঘটে বাংলার শেষ নবাবের। ফলে যুদ্দের পরাজয় বরণ করে নবাব,স্ত্রী লুৎফুন্নেসা,কণ্যা উম্মে জহুরা,বিশ্বাসী খোজাকে সঙ্গে নিয়ে পাটনায় চলে যাওয়ার চেষ্ট করেন। বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সাধারণ বেশে রাজমহল ছেড়ে যাওয়ার সময় ভগবান গোলায় দানসা ফকিরের চক্রান্তের শিকার হন। মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে মোহম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে। শুধু তাই না সিরাজের মৃতদেহ হাতীর পিঠে চড়িয়ে পুরো শহর ঘোরানো হয়েছিলো। পরে খোশবাগে পিতামহ,স্ত্রী,কন্যাসহ সমাহিত হন। এভাবে পলাশী যুদ্ধের নামে নাটকীয় যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার শেষ নবাবের পরাজয় ঘটে। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেবাদাসদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি-কোটি টাকার অর্থ সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করে। বাংলাদেশ থেকে লুটকৃত পুঁজির সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এককালের প্রাচ্যের স্বর্গ সোনার বাংলা পরিণত হয় শ্মশান বাংলায়, স্থান পায় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশে। এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে ধীরে-ধীরে বাংলা ব্রিটিশদের অধিকারে চলে আসে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ এমনকী এশিয়ার অন্য অংশও নিজেদের দখলে নিয়ে আসে। পলাশীর রক্তাক্ত ইতিহাস, পরাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রামীদের পরাজয়ের ইতিহাস, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, ট্রাজেডি ও বেদনাময় এক শোক স্মৃতির ইতিহাস। এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুঁজিপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। ইংরেজ ও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়। ফলে দেশীয় কৃষ্টি-সৃংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। বিকাশমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা মরণ কামড় দেয়। পলাশী বিপর্যয়ের পর শোষিত বঞ্চিত শ্রেণী একদিনের জন্যও স্বাধীনতা সংগ্রাম বন্ধ রাখেনি। এ জন্যই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকেই একমাত্র প্রতিপক্ষ মনে করত। ফলে দীর্ঘ দুইশ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রামের ফলে ব্রিটিশরা লেজ গুটাতে বাধ্য হয়। পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নানা রকমের রটনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক নবাব। যিনি বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি। তিনি নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য দেশপ্রেমকে বিকিয়ে দেননি। জীবন দিয়ে নবাবের সম্মান বজায় রেখেছিলেন। তবে বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাবের পারিবারিক কবরস্থানের যে,হাল হকিকত তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। চারিদিকে ঝোপঝাড়,আর বন্য বানরের জালাতন। মানুষের কমবেশি পদচারণা থাকলেও তেমন কোন সুযোগ সুবিধা নেই দর্শনার্থী বা পর্যটকদের জন্য। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদাসীনতার জন্যই এমনটি হচ্ছে বলে স্থানীয় মুসলমানদের ধারনা। তাই সময় হলে সবার উচিত বাংলার শেষ নবাবকে শ্রদ্ধা জানাতে মুর্শিদাবাদ যাওয়া। কারণ তিনি ছিলেন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক নবাব।

লেখক: সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি- জিটিভি ও দৈনিক আমাদের সময় -০১৭১৬২০৮৬৩১

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

বেলকুচিতে বায়াতুস সালাত জামে  মসজিদের উদ্বোধন

জহুরুল ইসলাম, উপজেলা প্রতিনিধি || যমুনাপ্রবাহ.কম বেলকুচি : সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌর এলাকার শেরনগর পশ্চিম পাড়া বায়াতুস …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।