সদ্য সংবাদ
Home / গুরুত্বপূর্ণ / বৈশাখী কাপড় নিয়ে বিপাকে তাঁতমালিক ও ব্যবসায়ীরা

বৈশাখী কাপড় নিয়ে বিপাকে তাঁতমালিক ও ব্যবসায়ীরা

রফিক মোল্লা, উপজেলা প্রতিনিধ|| যমুনাপ্রবাহ.কম

চৌহালী: করোনায় এবারও বৈশাখী মেলা হচ্ছে না। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে গত বছর এবং এবারের বিশেষ ধরণের উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলাধীন এনায়েতপুর ও বেলকুচি সহ দক্ষিনাঞ্চলের তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কয়েক হাজার কোটি টাকার উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রি করতে না পারায় অনেক মালিক বাধ্য হয়ে তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এ শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছেন।
তাঁত কারখানা মালিকরা বলছেন, উৎপাদিত বস্ত্র বিক্রি করতে না পারায় তাঁত শিল্প এবং এ শিল্পের সাথে জড়িতরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। লকডাউনের কারণে বৈশাখী মেলা হবেনা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বৈশাখী কাপড় কেনার জন্য বেপারীরা আসবেন না, তাই কাপড়ও বিক্রি হবে না। বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ ধরণের শাড়ী, লুঙ্গি, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, সালোয়ার-কামিজ তৈরি করা হয়। এই তাঁতবস্ত্র শিশু, নারী-পুরুষ শুধু পহেলা বৈশাখেই পড়েন। অনন্য মওসুমে এই তাঁতবস্ত্র বিক্রি হয় না। গত বছর এবং এবার মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার বৈশাখী কাপড় গুদামে পড়ে রয়েছে। সরকারিভাবে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িতদের প্রণোদনার ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও প্রকট আকার ধারন করবে। অনেকেই মত প্রকাশ কররেছেন, করোনার কারণে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। আর এতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, করোনার পর থেকেই তাঁতবস্ত্রের ব্যবসায় মন্দা ভাব শুরু হয়। বর্তমানে মন্দাভাব স্থায়ী রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁতের উৎপাদিত শাড়ী লুঙ্গীর বিক্রি প্রায় ৮০শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদিত পণ্যের অব্যাহত লোকসানে তাঁতিরা পুজি হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক তাঁতিরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ঋণ পরিশোধ ব্যর্থ হয়ে অনেকেই তাঁত বিক্রি করে কেউ পোষাক শিল্পে, কেউবা মাটি কাটা শ্রমিক আবার কেউ রিক্সা চালকের কাজ নিয়েছেন। কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেকের বেশি তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঋণগ্রহিতরা তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। তাঁত বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই জ্বালানি হিসেবে তাঁতের কাঠ ও ভাঙ্গড়ীর দোকানে লোহা বিক্রয় করছেন।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ তাঁত সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত। জেলার এনায়েতপুর- বেলকুচি, শাহজাদপুর, সদর ও উল্লাপাড়া উপজেলায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। জেলা তাঁত মালিক সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা লক্ষাধিক এবং এবং বিদ্যুত চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ৪ লাখ পরিবারের ১২ লাখ শিশু ও নারী পুরুষ। এছাড়া অনান্য ব্যবসা ও পেশার লোকজন তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশের সর্ববৃহৎ এনায়েতপুর, বেলকুচির সোহাগপুর ও শাহজাদপুর কাপড়ের হাট গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে এবং কাপড় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এনায়েতপুর ও সোহাগপুর হাটে প্রতি সপ্তাহের চারদিন (দিনরাত মিলে) কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাপড় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা এই হাটে এসে শাড়ী, লুঙ্গি ক্রয় করে থাকেন। প্রতিহাটে ভারতে শাড়ী ও লুঙ্গি রফতানি হয়ে থাকে। প্রতি হাটে ব্যাংক ও নগদসহ প্রায় দেড়শতাধিক কোটি টাকার লেনদেন হতো। বর্তমানে কাপড় ক্রয়-বিক্রয়, রফতানী ও ব্যাংক লেনদেন প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে খেলাপী ঋণের সংখ্যা বেড়েছে।
চৌহালী উপজেলার খামামগ্রাম ও এনায়েতপুর থানার খুকনী গ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুঁজি হারিয়ে তাঁত বিক্রি করে দিয়ে রাতের আধারে গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে এসেছি। এখন পোষাক কারখানায় কাজ করছি। এলাকায় এক সময় প্রচুর দাপট ছিলো। অনেক দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করেছি। এখন নিঃস্ব হয়ে মানসন্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছি। এনায়েতপুরের গোপালপুরের বিশিষ্ট তাঁত ব্যবসায়ী হাজী শেখ আবদুস ছালাম বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন ভয়াবহ অবস্থা কোনদিন দেখিনি। কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরীর টাকাই জোগাড় হচ্ছেনা। গুদামে কয়েক কোটি টাকার কাপড় মজুদ হয়ে আছে। খুকনী গ্রামের অন্য একম তাঁত মালিক জানান, জমি বিক্রি করে বাংকের সুদের ১৬ লাখ টাকা দিয়েছি। মোট ৩০৪ টি তাঁতের মধ্যে মাত্র ৫০টি তাঁত চালু রেখেছি।
এদিকে রফতানিকারক মেসার্স ফিরোজ ইউভিং ফ্যাক্টরির সত্বাধিকারী হাজী ফিরোজ হাসান অনিক বলেন, শুল্কমুক্ত হওয়ায় তিন বছর আগে ছয়টি রফতানীকারক প্রতিষ্ঠান এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও সোহাগপুর হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে চার লাখ পিচ শাড়ী ও লুঙ্গী ভারতে রফতানী করতো। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কাপড় রফতানী হতো। করোনার কারণে বিদেশে তাঁত বস্ত্র রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনা দেয়া না হলে তাঁত শিল্পে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এনায়েতপুর ও বেলকুচির একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জানান, করোনার পর থেকে ব্যাংকের লেনদেন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বেশিরভাগ তাঁত মালিকরা শুধু শাড়ী ও লুঙ্গি তৈরি করে থাকেন। অন্য কোন কাপড় তারা তৈরি করেন না। করোনার কারণে বাজার মন্দা হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদিত কাপড় কমমূল্যে এবং বাকিতে বিক্রি করায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারছেন না। সে কারণে খেলাপী ঋনের সংখ্যা বাড়ছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি হাজী বদিউজ্জামান জানান, তাঁত শিল্পের প্রতি সরকারের কোন সু-নজর নেই। সারাদেশের প্রায় তিন কোটি লোক এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জেই প্রায় ৩ লক্ষাধিক তাঁত রয়েছে। করোনার শুরু থেকে অব্যাহত লোকসানের কারণে প্রায় ৭০ ভাগ তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁতমালিক, শ্রমিক ও কাপড় ব্যবসায়ীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। প্রান্তিক তাঁতীরা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সবাইকে পথে বসতে হবে।

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

সিরাজগঞ্জে পৃথক সড়ক দূর্ঘটনায় মহিলাসহ নিহত ২ (ভিডিওসহ)

আপডেট সময় : ০৬:২০ ঘন্টা: ১৩ মে, ২০২১ নিজস্ব প্রতিবেদক || যমুনাপ্রবাহ.কম সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *