সদ্য সংবাদ
Home / গুরুত্বপূর্ণ / ফিরিয়ে দাও ঐতিহ্যের রেলসিটি, ফিরিয়ে দাও নদীবন্দর!

ফিরিয়ে দাও ঐতিহ্যের রেলসিটি, ফিরিয়ে দাও নদীবন্দর!

রেল ও নদীবন্দর বঞ্চিত হয়ে অন্ধকারে সিরাজগঞ্জ শহর

মোস্তফা কামাল

নদীবন্দর থেকেই জন্ম হয়েছে সিরাজগঞ্জ শহরের। ব্রিটিশ ভারতের বন্দরনগরী সিরাজগঞ্জকে রেলপথ দ্বারা কোলকাতার সাথে যুক্ত করা হয়। ষ্টিমার দিয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট হয়ে ঢাকা চট্টগ্রামের সাথে প্রতিষ্ঠা করা হয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। যমুনা ব্রহ্মপুত্র বিধৌত সিরাজগঞ্জ টাঙ্গাইল ময়মসিংহ পাবনা জামালপুর সহ আরও বহু বিস্তৃর্ণ এলাকার পাট সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে সিরাজগঞ্জ। কোলকাতা এবং ডান্ডির পাট শিল্পগুলোতে পাট যোগানোর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় সিরাজগঞ্জ। পাট অবতরণের সুবিধার্থে শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খাল কেটে সংস্কার করা হয়। যার নাম হয় কাটাখালি। এই খালের দুই পারে বিড়ালা, রেলি, ল্যান্ডডেন্ট কোম্পানীর মত বহু বিখ্যাত কোম্পানী গড়ে তোলে গুদাম অফিস পাটের বেল তৈরীর কারখানা। শত বছর পরেও আজও বিড়ালা রেলি কুটির নাম এই জনপদ থেকে মুছে যায়নি।


বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে ব্রিটিশ ভারতীয় রেলওয়ে ছোট এই বন্দর নগরীতে গড়ে তোলে চার চারটি রেলওয়ে ষ্টেশন। রায়পুর, বাজার স্টেশন, বাহিরগোলা ও সিরাজগঞ্জ ঘাট। শুধু বাংলা নয় তদানিন্তন সমস্ত ভারতবর্ষে একটি ছোট শহরে চার চারটি রেল ষ্টেশনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। এটা খুবই বৈশিষ্টসূচক ঘটনা এবং এটাতে প্রকাশ পায় রেলের সাথে সিরাজগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়। সিরাজগঞ্জকে মূলত গড়ে তোলা হয় রেলসিটি হিসেবে। চারটি রেলষ্টেশন নদী বন্দর শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহমান কাটাখালি এরই পাশে পাটের কারবার সব মিলিয়ে এক জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে সিরাজগঞ্জ শহর বিকশিত হয়ে উঠে। বাংলাদেশ হবার পরেও এই সেদিন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ শহর রেলকে কেন্দ্র করে জমজমাট নগরী হিসেবে টিকেছিল।
সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশন থেকে রাজশাহী খুলনা ঈশ্বদী-ঢাকা যাবার জন্য সরাসরি রেল যাত্রার সুবিধা বিদ্যমান ছিল। যে কারণে বাজার স্টেশন এলাকার কখনো দোকানপাট বন্ধ হতো না। সারারাত আলো জলমল থাকতো এই নগর কেন্দ্রটি। যার ক্ষয়িষ্ণু রেশ এখনও রয়ে গেছে।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল সংযোগ দেবার সময় সিরাজগঞ্জ শহরকে সম্পূর্ণ রেল বঞ্চিত করে শহর থেকে ৭কিঃ মিঃ দূরে কড্ডা হয়ে রেল লাইন নিয়ে যাওয়া হয়। সিরাজগঞ্জকে বিছিন্ন করে ফেলা হয় এই শহরে মূল শিকড়ের সাথে। সেই থেকে উজ্জল সেতুর নীচে অন্ধকারে ডুবে আছে সিরাজগঞ্জ শহর।
অথচ সঠিক এবং পরিণামদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে বহু টাকার অপচয় রোধ করে সিরাজগঞ্জ বাজার ও রায়পুরের মধ্যে রেলের বিশাল উন্নয়নকৃত ভুমি ও অব কাঠামো ব্যবহার করে বিদ্যমান রেল সড়ককে কাজে লাগিয়ে এই সমস্ত রেল স্টেশন চালু রেখে পূর্বের মালশাপাড়া ঘাট রেল লাইন তাজা করে বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল সংযোগ দেওয়া যেত। এতে রেল সিটি সিরাজগঞ্জকে গলা টিপে মেরে ফেলা থেকে রক্ষা করা যেত।


সিরাজগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সিরাজগঞ্জের রেল ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেবার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করছে-দাবী জানাচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনাপ্রণয়নকারীদের এতে কোন ভ্রক্ষেপ নেই। সিরাজগঞ্জের মানুষ ক্ষতি যা হয়েছে অন্তত তা পুষিয়ে নিতে আশা করেছিল উত্তর বঙ্গের সাথে বগুড়া হয়ে সেতু পর্যন্ত রেল লাইন কাজিপুর সিরাজগঞ্জ পুরাতন বয়ড়া ঘাট বাহিরগোলা বাজার স্টেশন হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুতে সংযোগ দেওয়া হবে।
কিন্তু সর্বশেষ খবরে জানা গেছে সিরাজগঞ্জ বগুড়া রেলপথটি শহর থেকে ৭ কিঃ মিঃ দুরে কড্ডা দিয়েই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই খবর সিরাজগঞ্জ শহরবাসীকে যারপর নাই হতাশ করেছে।
সিরাজগঞ্জ জেলার বেশীর ভাগ এলাকার মানুষের জন্য কড্ডায় নির্মিত শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন কোন উপকারে আসেনা। বেলকুচি কামারখন্দের মানুষ ব্যবহার করে জামতৈল স্টেশন। শাহজাদপুর উল্লাপাড়ার মানুষ ব্যবহার করে উল্লাপাড়া স্টেশন।
সিরাজগঞ্জ সদর কাজিপুর রায়গঞ্জ তাড়াশ ছাড়াও উল্লাপাড়া কামারখন্দ ও বেলকুচির আংশিক জনপদের মানুষের জন্য সিরাজগঞ্জ শহর হয়ে যাতায়াত বেশি সুবিধাজনক। দুর দুরান্তের মানুষ জেলা শহরের মধ্যে অবস্থিত স্টেশনে গাড়ী ধরতে এবং শহরে সময় কাটাতে বেশী সাচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদের শহরে বাড়ী নেই তারাও আত্মীয়স্বজনের বাড়ীতে বা শহরে বিভিন্ন কাজ করে সময় কাটাতে পারেন।
কড্ডায় গড়ে তোলা জনমানবশুন্য শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন রাতের যাত্রীদের জন্য যে কত বিরম্বনার সেটা ভুক্তভোগিরাই শুধু জানেন।
যে ভুল হয়েছে তা সংশোধন অযোগ্য নয়। সিরাজগঞ্জকে বাঁচাতে ভুল সংশোধন করে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা দেরীতে হলেও এখনি নিতে হবে। সিরাজগঞ্জকে বিকশিত করতে এর কেড়ে নেওয়া শিকড়কে আবার পুণঃ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
এজন্য-
(১) বঙ্গবন্ধু সেতুমুখী রেলপথ কালিয়া হরিপুর, রায়পুর, বাজার স্টেশন হয়ে পুরাতন মালশাপাড়া ঘাট দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুতে প্রধান রেললাইন টানতে হবে। বর্তমান সেতুতে সংযুক্ত কড্ডা মোড় হয়ে রেললাইন উঠিয়ে দিয়ে কৃষকদের ফসলী জমি ফেরত দিতে হবে। তিন ফসলী ঐ জমির মাটি সড়িয়ে ঐগুলোকে কৃষি জমিতে রূপান্তর করে ভূমি অপচয়কারী অপ্রয়োজনীয় অপরিনামদর্শী প্রকল্প সংশোধন করে কৃষি জমি উদ্ধারের উজ্জল নিদর্শন হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যদি তা করা সম্ভব নাও হয় ঐ লাইনটি শুধু মালামাল পরিবহনের জন্য রাখা যেতে পারে। কড্ডা মোড় থেকে কালিয়াহরিপুর বাজার স্টেশন পর্যন্ত সড়ক পথটি প্রসস্ত করে শহরের সাথে এই সমস্ত এলাকার যাতায়াতকে সুবিধাজনক করতে হবে।
(২) সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেল সড়ক কাজিপুর পিপুলবাড়ীয়া পুরাতন বয়ড়া ঘাট হয়ে বাহিরগোলা বাজার স্টেশন হয়ে মালশাপাড়া পুরাতন ঘাট দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুতে সংযোগ দিতে হবে।
(৩) সিরাজগঞ্জ শহর সংলগ্ন যমুনার পাড়ে নৌকা লঞ্চ স্পীডবোট ইত্যাদি হালকা নৌযান ভেরার উপযোগি বন্দর গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও দিয়ার পাঁচিল চায়না ক্রসবার এলাকায় জাহাজ ফেরী প্রভৃতি ভারী নৌযান ভেরার জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নদী বন্দর গড়ে তুলতে হবে।
(৪) কাটাখালীকে আবার যমুনার সাথে নৌ যোগাযোগের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগণ গাড়ীতে ভ্রমণকারী আমাদের দেশের পরিকল্পনাকারীরা রেল ইত্যাদি গণপরিবহন ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের অসুবিধা বুঝবেন বলে মনে হয় না। সেই স্বপ্ন সেই দক্ষতা সেই দেশপ্রেম তাদের মধ্যে বিকশিতই হয়নি।
সাধারণ সিরাজগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের দাবী আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। সোচ্চার হতে হবে তাদের নিকট থেকে কেড়ে নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে নেবার জন্য। উন্নয়ন কাজ করতে যেয়ে ভুল এবং অপরিনামদর্শী পরিকল্পনায় কেমন করে একটি বিকশিত জনপথকে তার জীবনদায়ী শিকড়ের সাথে বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকারে ঠেলে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল সংযোগের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা উচিত। এবিষয়ে জাতিকে সচেতন করতে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এবং এই পরিকল্পনায় যারা যারা জড়িত ছিলেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল সংযোগ বন্দর পরিকল্পনা সহ নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে সিরাজগঞ্জ শহরকে বাঁচাতে হবে।


এই সমস্ত ক্ষতিকর প্রকল্প সংশোধন করে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী পার্বতীপুর দিনাজপুরগামী সমস্ত রেলের টিকিট বিক্রি বাজার স্টেশন থেকে করতে হবে। এবং বাজার স্টেশনকে একটি প্রথম শ্রেণীর স্টেশন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বড় নদী বন্দর করার আগে এখনি এই মুহুর্তে যমুনার ঘাটে সুযোগ-সুবিধা সহ একটি অস্থায়ী নৌবন্দর চালু করে মানুষের দূর্ভোগ লাঘব করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যমুনা প্রবাহ ও যমুনাপ্রবাহ.কম

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

বঙ্গমাতা সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে শহীদ শেখ রাসেল দিবস উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ যমুনাপ্রবাহ.কম: নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *