রবিবার , জুলাই 25 2021
Home / রাজনীতি / আওয়ামীলীগ / নয় মাসে জাতীয় রাজনীতির দুই নক্ষত্র হারালো সিরাজগঞ্জ

নয় মাসে জাতীয় রাজনীতির দুই নক্ষত্র হারালো সিরাজগঞ্জ

স্বপন চন্দ্র দাস

যমুনাপ্রবাহ.কম : মোহাম্মদ নাসিমের ও এইচ.টি ইমাম-সিরাজগঞ্জের দুই কৃতি সন্তান দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতি এবং সরকারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। দুজনেই ছিলেন আওয়ামীলীগের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সহচর। দলের নীতি নির্ধারনী পদ ছাড়াও দীর্ঘদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। অপরদিকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পদ এবং ২০০৯ সালে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারের জনপ্রশাসন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন এইচটি ইমাম।
বুধবার (০ মার্চ) রাত সোয়া একটার দিকে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিতসাধীন লাইফ সাপোর্ট থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এইচ টি ইমাম। এর ঠিক ৮ মাস ২০ দিন আগে ২০২০ সালের ১৩ জুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার শ্যামলী স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিতসাধীন অবস্থায় মারা যান মোহাম্মদ নাসিম। অল্পদিনের ব্যবধানে এই দুই নেতাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ সিরাজগঞ্জবাসী।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কুড়িপাড়ায় জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ নাসিম বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা শহীদ এম মনসুর আলীর দ্বিতীয় সন্তান। আশির দশকের শেষভাগ থেকে মোহাম্মদ নাসিম জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বে দিয়ে জেল-জুলুম এমনকি রাজপথে পুলিশের লাঠিপেটাও সহ্য করতে হয়েছে নাসিমকে। টানা ৪ বারসহ মোট ৬ বারের সংসদ সদস্য নাসিম ১৯৯১ সালে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ৯৬ সালে দল ক্ষমতায় এলে প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ৫ বছর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মোহাম্মদ নাসিম আশির দশকের শেষভাগ থেকে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, পরবর্তীতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যের পাশাপাশি ১৪ দলের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন নাসিম।
প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের স্ত্রী লায়লা আনজুমান আরা বিথি ঢাকার শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। তাদের তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে প্রকৌশলী তানভীর শাকিল জয় সিরাজগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। মেজ ছেলে তমাল মনসুর ব্যবসায়ী এবং কনিষ্ঠ ছেলে তন্ময় মনসুর আমেরিকায় পড়াশোনা করছেন। নাসিমের বড় ভাই ড. মোহাম্মদ সেলিম বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের উপ-নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালেল ২২ জানুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অপরদিকে উল্লাপাড়া উপজেলার সোনতলা গ্রামের সন্তান এইচ.টি ইমামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৫ জানুয়ারি। তিনি ঢাকা কলিজিয়েট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্টিক পাসের পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএ, রাজশাহী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পাস করেন। এইচটি ইমাম পরবর্তীতে পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৯৬১ ব্যাচের সিএসপিদের মধ্যে ৪র্থ স্থান লাভ করেন। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরী করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে তিনি আওয়ামীলীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করলে এইচটি ইমামকে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৪ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। তিনি ২০০৯ থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবেও নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও এইচটি ইমাম আমৃত্যু আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
এইচটি ইমামের একমাত্র ছেলে তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জ-৪ আসন থেকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর তিন মেয়ের দুজন আমেরিকা প্রবাসী অপরজন ঢাকাতেই বসবাস করেন।
এদিকে এইচ ইমামকে হারিয়ে শোকে বিহবল সিরাজগঞ্জের আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। নয় মাসের ব্যবধানে জেলার উন্নয়ন ও রাজনীতির আশা ভরসার স্থল দুই নেতাকে হারিয়ে অনেকটাই শোকস্তব্ধ ও আশাহত জেলার বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ।
কলেজ শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, মোহাম্মদ নাসিম ও এইচটি ইমাম জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। আমরা পর্যায়ক্রমে জেলার কৃতি সন্তানদের হারিয়ে ফেলছি। এতে আমাদের উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ হওয়ার আশংকা রয়েছে।
ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর আমরা মোহাম্মদ নাসিমকে হারিয়েছি, এবার হারালাম এইচটি ইমামকে। এ দুই কীর্তিমান পুরুষের চলে যাওয়ায় সিরাজগঞ্জের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক ডা. জহুরুল হক রাজা বলেন, মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, আর এইচটি ইমাম প্রশাসনিক দক্ষতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রায় ৯ মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনীতির দুই মহানায়ককে হারিয়ে আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়লাম। সিরাজগঞ্জ শুধু নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়।
উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ফয়সাল কাদির রুমি বলেন, আমরা উল্লাপাড়াবাসী শোকাহত। এইচটি ইমাম স্যার ছিলেন আমাদের মুরুব্বী। তাঁর মৃত্যু আমাদের গভীর শূন্যতায় ফেলে দিল।
সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট কে এম হোসেন আলী হাসান বলেন, স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান শহীদ এম মনসুর আলী জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা তাঁর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম পূরণ করেন। একই সাথে এইচটি ইমাম জাতীয় রাজনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। একে একে আমরা সবাইকে হারিয়ে ফেলে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ছি।
তিনি বলেন, মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন দক্ষ সংগঠক ও জনপ্রিয় নেতা। তাঁর নেতৃত্বে সিরাজগঞ্জে যত উন্নয়ন হয়েছে যেটা বলে শেষ করা যাবে না। অপরদিকে এইচ টি ইমাম ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসক। তিনি স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সাথে দেশগঠনে কাজ করেছেন। এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। এ দুই মহান ব্যক্তিত্বের মুত্যুতে আমাদের সিরাজগঞ্জের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

করোনায় মারা গেলেন ছেলে, খবর পেয়ে বাবা-মার মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক || যমুনাপ্রবাহ.কম সিরাজগঞ্জ: ছেলে করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি, এমন খবর পেয়ে প্রথমে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।