শনিবার , জুলাই 31 2021
Home / গুরুত্বপূর্ণ / নির্ঘুম রাত, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছে শ্রমজীবি মানুষ

নির্ঘুম রাত, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছে শ্রমজীবি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক || যমুনাপ্রবাহ.কম

সিরাজগঞ্জ: ট্রাকের কেবিনের ছাদে চড়ে প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ভ্রমণ করছেন ষাট বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। বৃষ্টির হাত থেকে কোনমতে রক্ষা পেতে মাথায় গামছা বেঁধেছেন তিনি। তাঁর ঠিক পেছনেই অপর এক বৃদ্ধ ট্রাকের উপরে বসে বসেই ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন।

ধীরগতিতে চলছিল ট্রাকটি। বৃষ্টিতে কুকড়ে যাওয়া এ দুই বৃদ্ধকে ডাকলে প্রথম জন সাড়া দেন। তিনি তার নাম বলেন আজিজল মিয়া। ঘুমিয়ে থাকা অপর বৃদ্ধ তার বড় ভাই মোফাজ্জল। তারা দুজনেই ঢাকা শহরে রিকশা চালান। যাবেন গাইবান্ধায়।

জানতে চাইলে ওই বৃদ্ধ বলেন, সারারাত ঘুম নাই, সেতুর পূর্বপাড়ে রোদে পুড়েছেন পশ্চিমপাড়ে এসে বৃষ্টিতে ভিজছেন। তবুও তাকে বাড়ি যাওয়ার আনন্দে উল্লসিত মনে হলো এ বৃদ্ধকে। মঙ্গলবার (২০ জুলাই) বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কড্ডার মোড় এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ওই দুই বৃদ্ধের মতো খোলা ট্রাকে চেপে বৃষ্টিতে ভিজেই হাজার হাজার মানুষ নারীর টানে বাড়ির পথে ফিরছেন।

বৃষ্টি থেকে রক্ষায় দু-একটি ট্রাকে যাত্রীদের পলিথিনে জড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও বেশিরভাগ ট্রাকেই ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এসব ট্রাকের যাত্রীরা অধিকাংশই সোমবার (১৯ জুলাই) রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে রওয়ানা হয়েছেন। পুরো রাস্তায় যানজটের কারণে তিন ঘন্টার পথ আসতে ১৫ থেকে ১৬ ঘন্টা লেগেছে। ট্রাকের মধ্যে দাঁড়িয়ে বা গাদাগাদি করে বসে পুরো রাত জেগেই, কখনো রোদ আবার কখনো বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ছুটে চলেছেন উত্তরের হাজার হাজার যাত্রী।

গাজিপুরের চন্দ্রা থেকে সোমবার রাত ৯টার দিকে ট্রাক চড়েছেন আছিয়া খাতুন নামে ৫০ বছর বয়সী বিধবা এক নারী। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে সিরাজগঞ্জে পৌঁছেছেন তিনি। সাথে তার দুই সন্তানও রয়েছে। কাজিপুরের মেঘাই গ্রামের বাসিন্দা এ গার্মেন্টসকর্মী পুরো সাড়ে ১৬ ঘন্টার যাত্রাপথের দুর্ভোগের বিবরণ দিয়ে বলেন, চারশো ট্যাহা ভাড়া দিয়্যা ট্রাকে চড়ছি। রাস্তায় এত জ্যাম আর গরম, কষ্টের কুন শ্যাষ নাই। সারারাইত জাইগ্যা ছিলাম। ছওয়ালপাল নিয়্যা যে দ্যাশে আইসপার পারছি তাই ভাল লাইগত্যাছে।

আব্দুর রশিদ, পলাশ শেখ, মনিরুল ইসলাম, জেলহোসেন নামে আওর কয়েক গার্মেন্টসকর্মী বলেন, রাস্তায় যেন গাড়ী চলেই না। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে গাড়ী রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো রাত পার হল, দিনেরও অর্ধেক গেল এখন পর্যন্ত কারও খাওয়া-দাওয়া হয় নাই।

রাশেদ নামে ওষুধ কোম্পানীর এক কর্মকর্তা বাসযোগে এসেছেন। তিনি বলেন, বাসে শুধু একটি সিটে বসতে পেরেছি এটাই সুবিধা। তাছাড়া বাস আর ট্রাক একই কথা। পুরো রাস্তাই অচল। কষ্টের কোন শেষ নাই।

এসব যাত্রীদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, গাবতলী, মিরপুর, মহাখালী এবং চন্দ্রা বাসষ্ট্যান্ট থেকে রওয়ানা দিয়েছেন তারা। সবাই সোমবার রাত ৮ টা থেকে ১০টার মধ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। সিরাজগঞ্জে এসে পৌঁছেছেন একটা থেকে দেড়টার মধ্যে। পুরো ১৬ থেকে ১৭ ঘন্টার যাত্রায় ছিল সীমাহীন দুর্ভোগ। যারা ট্রাকে এসেছেন তাদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিনিদ্র রাত কাটানোর পর সকাল থেকে প্রচন্ড রোদ আর তীব্র গরম। আবার সেতুর পশ্চিম প্রান্তে এসেই বৃষ্টিতে ভিজে কুকড়ে যাওয়া। এতসব দুর্ভোগের মধ্যেও হাসি ছিল যাত্রীদের মুখে। ক্লান্ত-মলিন চেহারাতেও অজানা এক আনন্দের আভাষ ছিল তাদের চোখেমুখে। পরিবারের সাথে ঈদ-আনন্দ উপভোগের কাছে এসব দুর্ভোগ তাদের কাছে যেন কিছুই নয়।

বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, বাসের পাশাপাশি ট্রাকেও বিপুল সংখ্যক যাত্রী আসছেন। রোদ বৃষ্টিকে তুচ্ছ করে অনেক সীমাহীন কষ্ট নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে যাচ্ছেন।

সিরাজগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরাফত ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জের পুরো মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তায় পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। যানজট ও বা দুর্ঘটনারোধে পুলিশ নিরলস কাজ করছে। ট্রাকে চেপে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর ঘরে ফেরা নির্বিঘ্ন করতেও সচেষ্ট রয়েছে পুলিশ।

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

বেলকুচিতে বায়াতুস সালাত জামে  মসজিদের উদ্বোধন

জহুরুল ইসলাম, উপজেলা প্রতিনিধি || যমুনাপ্রবাহ.কম বেলকুচি : সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌর এলাকার শেরনগর পশ্চিম পাড়া বায়াতুস …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।