সদ্য সংবাদ
Home / অপরাধ / কামারখন্দে শতাধিক মানুষের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা আওয়ামীলীগ নেতার ছেলে

কামারখন্দে শতাধিক মানুষের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা আওয়ামীলীগ নেতার ছেলে

নিজস্ব প্রতিবেদক || যমুনাপ্রবাহ.কম

প্রকাশ কাল: ২২১৭ ঘন্টা, ৪ জুলাই, ২০২১

সিরাজগঞ্জ: কখনো জমি বিক্রি আবার কখনো বন্ধকী, আবার কখনো চাকরী দেবার নাম করে গাঁয়ের সহজ-সরল মানুষকে ভূলিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতেন তিনি। এছাড়া দরিদ্রদের নিয়ে সমিতি করে চাঁদার টাকাও আত্মাসাত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এভাবেই শতাধিক মানুষের প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি গোলবার হোসেনের ছেলে মো. আশরাফুল ইসলাম ফরিদুল।
এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কামারখন্দ আমলী আদালতে ৯টি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা। অপরদিকে “হতদরিদ্র সমবায় সমিতি” নাম দিয়ে একশো জন সদস্যের ৫ লাখেরও বেশি টাকা আত্মাসাতের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। রোববার (২ জুলাই) সরেজমিনে কামারখন্দ উপজেলার গাড়াবাড়ী ও পাশ্ববর্তী উল্লাপাড়া উপজেলার ধুনচি গ্রামে গেলে ভুক্তভোগী অসংখ্য নারী ও পুরুষেরা একের পর এক তাদের অভিযোগ জানাতে থাকে।
গাড়াবাড়ী গ্রামের কৃষক ফরহাদ আলী বলেন, রিকশা চালিয়ে আর নিজের সামান্য জমিতে কৃষি কাজ করে টাকা জমিয়েছিলাম। কষ্টার্জিত টাকার মধ্যে আড়াই লাখ দিয়ে দুই বিঘা জমি বন্ধকী নেই আশরাফুলের কাছে। এরপর তিনি তার ১৮ শতক জমি বিক্রি করতে চাইলে তা কেনার জন্য আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়েছি। টাকা নেয়ার কয়েকদিন পরই পালিয়ে গেছে আশরাফুল।
একই গ্রামের রাশেদা বেগম বলেন, আমার সাথে খুব খাতির ছিল আশরাফুলের। এ কারণে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৩ লাখ টাকা হাওলাত চেয়েছিল। আমি ২ লাখ ৯১ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। একমাসের মধ্যে ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্তও টাকা ফেরত পাই নাই।
চর গাড়াবাড়ী গ্রামের আনিছা বেগম বলেন, পিয়ন পদে ছেলেকে চাকরী দেয়ার কথা বলে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন আশরাফুল। এরপর থেকেই খোঁজ নেই তারা।
এভাবে গাড়াবাড়ির ফরিদুলের ইসলামের কাছে হাওলাত ১ লাখ ৮০ হাজার, ২ বিঘা জমি বন্ধক রেখে রাবেয়ার কাছে ২ লাখ ২০ হাজার, এক বিঘা জমি বন্ধক আছিয়া বেগেমর কাছে ১ লাখ ৪০ হাজার, জমি বন্ধক বাবদ গাড়াবাড়ীর তাহমিনা খাতুনের আড়াই লাখ ও উল্লাপাড়া উপজেলার ধুনচি গ্রামের ঠান্ডু আকন্দের কাছে হাওলাত বাবদ ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
অপরদিকে হতদরিদ্র সমবায় সমিতির ১শ জন সদস্যের গচ্ছিত ৫ লাখ ১ হাজার টাকাও ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে নিয়েছেন বলে আদায়কারী জিল্লুর রহমান জানান। প্রতারিত এসব ভুক্তভোগী প্রত্যেকেই আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে মামলা করেননি এমন প্রতারিত মানুষের সংখ্যাও অনেক। উল্লাপাড়া উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামের আব্দুল লতিফের কাছে ৭ লাখ ২৫ হাজার, আত্মীয়তার সুবাদে একই গ্রামের রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ৪ লাখ ৪০ হাজার, একই উপজেলার ধুনচি গ্রামের রতন কুমার দাসের কাছে ১ লাখ ৫৫ হাজার, সুনীল চন্দ্র দাসের ৭০ হাজার, অনিল দাসের ২০ হাজার, রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী গ্রামের নরেশ দাসের ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও ধুনচি পাটনিপাড়ায় ২৮ জন সদস্য নিয়ে গঠিত সমিতির জমাকৃত সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন আশরাফুল।
ভুক্তভোগী ও গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আশরাফুল ইসলাম ফরিদুল প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতার গোলবার হোসেনের ছেলে, তাদের বেশ জমিজমাও রয়েছে। এছাড়াও বাবা-ছেলে দুজনেই কামারখন্দ রেজিষ্ট্রি অফিসের স্ট্যাম্প ভেন্ডার। এসব কারণে খুব সহজেই কয়েক মাসের মধ্যেই আত্মীয়তা কিংবা বন্ধুত্বের সুবাদে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। টাকা নেয়ার অল্পদিনের মধ্যেই তিনি নিখোঁজ হন। অনেকদিন খোঁজ না পেয়ে ভুক্তভোগীরা তার বাবার কাছে গেলে তিনি সবার টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রæতি দেন। এভাবে প্রায় দেড় বছর ধরে সময় নিতে থাকেন গোলবার হোসেন। এক পর্যায়ে আব্দুল মালেক, আব্দুল মজিদ ও কালাম মেম্বরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে তার বাবা গোলবার হোসেনের কাছে গেলে তিনি অস্বীকার করেন। বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীরা শালিসী বৈঠকের আয়োজন করলে সেখানেও অনুপস্থিত ছিলেন গোলবার হোসেন।
এভাবে দীর্ঘ সময় পার হবার পর একে একে আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এসব মামলায় আশরাফুল ইসলাম ফরিদুল ছাড়াও তার বাবা গোলবার হোসেন, স্ত্রী রহিমা বেগম এবং শ্যালক দুলাল মাস্টার ও বোন জামাই আমিনুল ইসলামকে আসামী করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের আইনজীবি অ্যাডভোকেট নাসিম সরকার ৯টি মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গাড়াবাড়ি গ্রামের মাতব্বর আব্দুল মালেক জানান, বেশ কয়েক বছর আগে আশরাফুল ইসলাম ফরিদুল গাঁয়ের অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। আমরা তার বাবাকে বার বার বলেছি কমবেশি করে টাকাগুলো ফেরত দেয়ার জন্য। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেও তিনি ওই টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।
এসব বিষয়ে জানতে পলাতক আশরাফুল ইসলাম ফরিদুলের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তার বাবা আওয়ামীলীগ নেতা গোলাবার হোসেন বলেন, আমার ছেলে কোন টাকা নেয়নি। টাকা নেয়ার কোন প্রমান তারা দেখাতে পারবে না বলে দাবী করেন তিনি। তার ছেলে কোথায় আছে জানতে চাইলে বলেন, তিন বছর ধরে আমার ছেলেকে গুম করে রেখেছে ওইসব সন্ত্রাসীরা।
গুমের বিষয়ে থানা বা আদালতে কোন অভিযোগ করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওদের ভাগ্য ভাল যে আমি এখন পর্যন্ত গুমের কোন মামলা করি নাই।
কামারখন্দ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সুপার বরাবর গাড়াবাড়ি এলাকার একটি সময়বায় সমিতির টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। আমরা সেটির তদন্ত করছি।
কামারখন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেরিনা সুলতানা জানান, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে তদন্তের জন্য চিঠি পেয়েছি। ইতিমধ্যে তদন্তের জন্য উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ সবুজ বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে গোলবার ভেন্ডারের ছেলে আশরাফুল ইসলাম ফরিদুল এলাকার মানুষের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবার কথা শুনেছিলাম। তবে এসব বিষয়ে কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি।

About jamuna

আবার চেষ্টা করুন

মা ইলিশ ধরার দায়ে ১৬ জেলের কারাদন্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ যমুনাপ্রবাহ.কম : সিরাজগঞ্জের তিনটি উপজেলায় যমুনা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ১৬ জেলেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *